Monday, December 26, 2016

মিশেল ফুকোর “গভার্নমেন্টালিটি” ও শোষণের নয়া ঢং

(শেষ খন্ড)

নব্য উদারনৈতিকরাজনীতি

থমাস লেমকে (Thomas Lemkeতাঁর আলোচনায় গভার্নমেন্টালিটি তত্ত্ব দিয়ে নব্য উদারনৈতিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যে শাসন, শোষণ কিংবা ক্ষমতা চর্চার ধরন রয়েছে সেগুলিকে সামনে এনে সমালোচনা করেছেন। তিনি ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এন্থনি গিডেন্স, পিয়েরে বুর্দোর কাজের যোগসূত্রতা অনুধাবন করে, তাদের মার্ক্সিস্ট তত্ত্বের আলোকে নব্য উদারনৈতিকতাবাদের কিছু সমালোচনা উল্লেখ করেন। প্রথমত,নব্য উদারনৈতিকতাবাদ হচ্ছে একটা মতাদর্শ। দ্বিতীয়ত, এটা এমন পরিকল্পনা যার লক্ষ্য হচ্ছেঅসভ্যধনতন্ত্রকেসভ্যকরা এবং তৃতীয়ত, নব্য উদারনৈতিকতাবাদ হচ্ছে একধরনের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা। লেমকে মনে করেন, যদি এই তিনটি
সমালোচনা সঠিকভাবে নব্য উদারনৈতিক শোষণের কোন একটির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তবে তা গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করবে। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নব্য উদারনৈতিক আমলেযৌক্তিক চর্চাকে বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়।তবে,চর্চা এবং যু্ক্তির মধ্যকার সম্পর্ক কি তা অন্বেষণে ফুকো মনোনিবেশ করেননি বরং তার জিজ্ঞাসা ছিলো কোন কোন ধরনের যৌক্তিকতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে।তিনি বলতে থাকেন,একজন মানুষ স্বকীয়ভাবেই কোন কিছুকে যৌক্তিক বলে দাবি করতে পারেনা বরং এর পেছনে ঐতিহাসিক এবং সামাজিক সম্মতি রয়েছে। এক্ষেত্রে থমাস লেমকে ফুকোর কারাগারের উদাহরণ টেনে বলেন,গণভাবে শাস্তি প্রদান এবং কারাগারের মধ্যে শাস্তি প্রদানের মধ্যে তফাৎ রযেছে। বাস্তবে দেখা যায় কারাগারে যে শাস্তি দেয়া হয় তার তুলনায় গণক্ষেত্রে শাস্তি দেয়া মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয় কিন্তু এটা অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে মনে হয় একারণে যে একধরণের যৌক্তিকতার ভিত্তিতে সমাজ রাষ্ট্র এটাকে অবৈধ করে রেখেছে ।অন্যদিকে, কারাগারের ভূমিকা কখনো প্রশ্নের সম্মূখীন হয়না। ফুকো বলতে থাকেন, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এখানে লক্ষ্য করতে হবে কোন যৌক্তিকতার ভিত্তিতে কারাগার ব্যবস্থাকে জারি রাখা হয়। রাষ্ট্রে জেলখানা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তুলনামুলকভাবে এর আয়তন হয়তো খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু এর প্রভাব এবং কর্তৃত্ব অপরিসীম।ফুকো ইঙ্গিত করেন,আধুনিক সমাজের ভেতর দিয়ে একটিকার্সেরাল কন্টিনিউয়ামপ্রবাহিত। দূর্ভেদ্য নিরাপত্তা কারাগার থেকে শুরু করে নিরাপদ বাসস্থান, প্রবেশন, সমাজকর্মী, পুলিশ শিক্ষকদের মাধ্যমে আমাদের প্রতিদিনকার কাজের জায়গা আর গার্হস্থ্য জীবনেও এই প্রবাহ বহমান। সব কিছুই কিছু মানুষ দিয়ে অন্য মানুষদের তদারক করার মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে আছে  ফুকোর বক্তব্য অনুযায়ী

জেলখানা আসলে অপরাধ দমন করেনা বরং দমন করে অপরাধীকে। শাসন ক্ষমতায় আসীনরা যখন দেখল যে এটি বেশ খানিকটা সুবিধাজনক। অল্প খরচে,স্বল্প লোকবলের সাহায্যে মোটামুটি নির্বিঘ্নে অনেক সংখ্যক মানুষকে নিয়ন্ত্রন করা যায় এইডিসিপিলিনারি কন্ট্রোলসিস্টেমে তখন থেকেই শুরু অপরাধ দমনের বদলে অপরাধী নিয়ন্ত্রনের কৌশলের। কিন্তু শুরুতে জেলখানার কাঠামো মূখ্য ভূমিকা রাখলেও এরপর প্রধান হয়ে দাড়ায় অপরাধ আইন, আইনী প্রক্রিয়া, আদালত, পুলিশ, ইত্যাদি। এসব কিছু মিলেই গড়ে ওঠেপেনাল সিস্টেমযা সমাজের সমস্ত মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট আইনের আওতায় বিশেষ বিশেষ কাজকে অপরাধ বলে গণ্য-মান্য করতে বাধ্য করে। নতুন নতুন আইন এর প্রয়োগের প্রতি সাধারণ মানুষের এই যে বশ্যতা, তা আপাতঃদৃষ্টিতে সর্বসম্মতিক্রমে দেখা গেলেও আদতে তা জোরপূর্বক আদায় করা হয়। তবে এই জোর ব্যাক্তির শারীরিক শক্তি থেকে আসে না, আসে বিশেষজ্ঞের মুখ থেকে উচ্চারিতবৈজ্ঞানিক জ্ঞানএর তকমা নিয়ে।

থমাস লেমকে ফুকোর গভার্নমেন্টালিটি প্রত্যয়টি কিভাবে নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত রাজনীতিকে বুঝতে সহায়তা করে সেবিষয়টিও স্পষ্ট করেন। এক্ষেত্রে যুক্তি হচ্ছে সমাজে কিছুআসলএবং কিছুঅরাজকঅর্থনীতি রয়েছে যেগুলিকে সমাজের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দ্বারাপরিচালিতকিংবাসভ্যকরা প্রয়োজন। থমাস লেমকে বলেন, যেহেতু আমরা মার্কসের আলোচনা থেকেই জানি যে,এমন কোন বাজার নেই যা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত আর  অর্থনীতি তো সর্বদাইরাজনৈতিক অর্থনীতি তিনি আরো মনে করেন, ফুকোর এই আলোচনা স্পষ্ট করে যে “art of government” শুধুমাত্র রাজনৈতিক অঙ্গণেই সীমাবদ্ধ নয় বরং অর্থনৈতিক সরকারের বিভিন্ন স্বকীয় আইন যৌক্তিকতার দ্বারা পরিচালিত উপাদান। তাঁর মতে, এই অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিককে নিয়ন্ত্রণ করছে তার শ্রমকে শোষণ/ভোগ করছে এবং বিভিন্ন যৌক্তিকতার মধ্য দিয়ে তাকে অধস্তন করে রাখছে।

ফুকোর গভার্নমেন্টালিটির আলোচনায় আরো উল্লেখ রয়েছে আত্ম প্রযুক্তি বা technologies of self যা নব্য উদারনৈতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় সব থেকে কার্যকর গুরুত্বপূর্ণ। এটা এমন এক প্রযুক্তির অংশ যার দ্বারা একদিকে ব্যক্তিকে স্বশাসনের কথা বলে স্বাধীনতার আশ্বাস দেয়া হয় অন্যদিকে সুক্ষ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব ধরণের দায়ভার তার নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়। তবে পুরো ব্যাপারটি এমন এমন রাজনীতি যেখানে ব্যক্তির চেতনায় স্বাধীনতা কিন্তু চৈতন্যের অন্তরালে পরাধীন থেকে আরো পরাধীন হয়ে যায়।

গভার্ণমেন্টালিটি,পলিসি এবং ইন্ডিভিজুয়ালের আচরণ

পলিসির সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক চিহ্নিত করেছেন শোর এবং রাইট (Shore and Wright) তাঁরা স্পষ্ট করেন কিভাবে করে সরকার (গভার্ণমেন্ট) পলিসির মধ্য দিয়ে নাগরিকের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে। তাঁরা চিহ্নিত করেন, পলিসি বিভিন্নভাবে ব্যক্তির উপর প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ তৈরী করে। যেমন পলিসি কখনো ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা উৎপাদন করে

গভার্ণমেন্টালিটি বিষয়ক উপরের আলোচনা স্পষ্টতা দেয় যে কিভাবে ইন্ডিভিজুয়াল সর্বদা surveillance বা নজরদারির মধ্যে থাকে। এই নজরদারি কারাগারে যেমন চৌকিদার বা ওয়াচম্যান করছে (ফুকো, ১৯৭৭) তেমনি বৃহত্তর সমাজে করছে মতাদর্শ। তবে আধুনিক নব্য উদারনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় পলিসি অতি সুক্ষ্য সফলভাবে এই দায়িত্ব পালন করছে। ফুকোর The History of Sexuality ( 1978 )  আলোচনা করলেই বিষয়ে ঐতিহাসিক প্রমাণাদি পাওয়া যায়। ফুকো যৌনতার দমন ধারণার সূচনা খুঁজেপান ১৭ শতকের ইউরোপে। তার বিশ্লেষণে ভিক্টোরিয়ান যুগে যৌনতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি দেখান এই সময়ে মানুষের যৌন অভিজ্ঞতাকে দমন করা একটি ক্ষমতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বর্পূণ,প্রথমত ভিক্টোরিয়ান সময়ে যৌনতার নিয়ন্ত্রণ ছিলো পুরোপুরি মতাদর্শ ভাবাদর্শের বিষয়। যেখানে ধর্মীয়ভাবেই বিষয়টি শর্তায়িত করা হয়েছিলো। পরর্বতীতে একই বিশ্বাস বিভিন্ন ডিসকোর্সে প্রভাব রেখেছে। আঠারো শতকে এবং উনিশ শতকে যৌনতা বিষয়ক ডিসকোর্স ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে মেডিসিন, মনোবিদ্যা, অপরাধ-বিচার,আইন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের শাখাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে দিয়ে মূলত, সরকারিভাবে বা প্রশাসনিকভাবে যৌনতাকে ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণের অনুসন্ধানের নয়া তাগিদ সামনে আসতে থাকে। যেমন, জনসংখ্যতাত্ত্বিক বিভাগ সরকারকে উৎসাহ করে জন্মহার, বৈধ এবং অবৈধ জন্ম, বয়সভিত্তিক বিবাহ, যৌন সম্পর্কের ধরণ, গর্ভধারণ এবং অন্যান্য বিষয়ে অনুসন্ধান করতে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে। এর ফলে, যৌনতার বিষয়গুলিও পর্যবেক্ষণের আওতায় চলে আসে। ঠিক এই ধারাবাহকিতায় আধুনকি নব্য উদারনতৈকি রাষ্ট্র তার পলিসিতে একই বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ন্ত্রণ জারি রেখেছে।যেমন,সরকাররে জনসংখ্যা বিষয়ক পলিসিতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কথা বলে সরকার ব্যক্তির যৌন জীবনে হস্তক্ষেপ করছে। আবার দেখা যায় এইচআইভি বিরোধী ক্যাম্পেইনে বা পলিসিতে মানুষকেঅবৈধ যৌন মিলনথেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পলিসি যৌনাচারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এভাবে বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ বা গভার্ণিং এর প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণের যে পলিসি তার পিছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে যেখানে গভার্ণমেন্টালিটির উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। ফরিদা আখতার দেখান প্রথম দিকে ১৯৪০ এর আগপর্যন্ত বাংলাদেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলাও একধরণের লজ্জার বিষয় ছিলো। এগুলি ছিলো পারিবারিক গোপনে আলোচনার বিষয়। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জনসংখ্য নিয়ন্ত্রণের পলিসি গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে মাঠকর্মীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের কাছে বিভিন্ন কৌশল, উপকারিতা এবং সম্ভাব্যতা সম্পর্কে বলতেন। ১৯৫২ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত কয়েকটি পর্যায়ে এই পলিসি সংশোধন হওয়ার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। একটা পর্যায়ে হাজার হাজার বন্ধ্যাত্ব করনের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে এসব ঘটনা ঘটানো হয়। বলা হয়েছেছোট পরিবার সুখি পরিবার”, “দুটির বেশী নয় একটি হলে ভালো হয়ইত্যাদি বাগাড়ম্বরপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আদতে, রাষ্ট্র পুরো প্রক্রিয়া technic of self এর মধ্য দিয়ে করেছে যেখানে ব্যক্তি একটা সময়ে ভাবতে শুরু করলো ছোট পরিবার হলে আমাদেরই লাভ। কিন্তু ফরিদা আখতার দেখান এর পিছনে বৈশ্বিক এবং রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ছিলো। বিভিন্ন বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানি তাদের কনট্রাসেপটিভ ঔষদ বা সামগ্রী বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে অন্যদিকে সরকারও তার চাহিদা মত জনসংখ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। ফলে, গভার্নর,গভার্নমেন্টালিটি এবং পলিসির মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান থেকেছে। এভাবে, পলিসি সবসময় সরকারের ক্ষমতার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

শেষ কথা


পলিসি, গভার্নমেন্টালিটি এবং ক্ষমতা বা শাসনের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। এগুলি পরস্পর আন্তপ্রবিষ্ট বিষয়।আধুনিক পুঁজিবাদ মানুষের আচরণকে বহুমাত্রকি করেছে, ক্রমশ্চতা দিয়েছে। আবার এই পুঁজিবাদ প্রভাবিত মতাদর্শ এই ক্রমশ্চতাকে বৈধতা দিয়েছে। নব্য উদারনৈতিক এই আমলে ব্যক্তির স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে একদিকে, অন্যদিকে এই স্বাধীনতাকে সীমায়িত করা হয়েছে আড়ালে। ব্যাপারটি এমন যে, গাধার পিটে ঝোলা তুলে দিয়ে, একটি মাত্র রাস্তা খোলা রেখে বলা হচ্ছে, যাও তোমার পছন্দমতো রাস্তা দিয়ে যাও। গাঁধা মনে করছে, এইতো আমি স্বাধীন। আমার ক্ষমতা আছে ইচ্ছা মতো চলার। আদতে সে পরাধীনই। তাকে পরিচালিত করা হচ্ছে তার চৈতন্যের অন্তরালে। পার্থক্য হচ্ছে, প্রাচীন ব্যবস্থায় ব্যক্তিকে বাধ্য করার দায় যেখানে রাষ্ট্রের ঘাড়ে পড়তো, নব্য উদারনৈতিক ব্যবস্থায় এই দায়ভার স্বয়ং ব্যক্তির ঘাড়ে কেননা তাকে স্বাধীনতার বুলি শোনানো হয়েছে এবং সে তা বিশ্বাস করেছে।

দ্বিতীয় খন্ড পড়ুন

প্রথম খন্ড পড়ুন

লিখেছেনঃ তত্ত্বের ভক্ত

No comments:

Post a Comment