Sunday, December 25, 2016

মিশেল ফুকোর “গভার্নমেন্টালিটি” ও শোষণের নয়া ঢং

(দ্বিতীয় খন্ড)

গভার্নমেন্টালিটির তত্ত্বীয় আলোচনা 

যদিও ‘গভার্নমেন্টালিটি’ প্রত্যয়টি ফুকোর তত্ত্বায়নের অংশ তবে ফুকো স্পষ্টভাবে এ বিষয়ে আলাদা কোন বই বা প্রবন্ধ লেখেননি বরং তাঁর বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনাতে বিষয়টি এসেছে। পরবর্তীতে ফুকোর শিষ্যরা এবং অন্যান্য উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকগণ এই তত্ত্বের আলোচনার প্রসার ঘটান। কিছু পন্ডিতের মতে, governmentality হচ্ছে “gouverner” এবং “mentalite” এর মধ্যকার যোগসূত্রিতা। তবে, ফুকো তাঁর আলোচনায় গভার্নমেন্টালিটি দ্বারা শুধুমাত্র শক্তপোক্ত রাজনৈতিক সংজ্ঞাই দেননি বরং আরো বিস্তৃতভাবে ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করে দেখেছেন।


ফুকো Collège de France এ এক বক্তৃতায় গভার্নমেন্টালিটিকে আর্ট অব গভার্নমেন্ট বলে উল্লেখ করেন। তিনি এই প্রত্যয় দ্বারা রাষ্ট্রের এমন কিছু আইডিয়া ও বৈশিষ্ট্যকে বুঝিয়েছেন যা শুধুমাত্র রাজনীতিকে না বুঝিয়ে এবং একজনের দ্বারা জনসংখ্যাকে শাসনের পরিবর্তে বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ কৌশল এবং জৈব রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে বুঝিয়েছেন। মূলত, গভার্নমেন্টালিটির ধারণাটির মাধ্যমে ফুকো ক্ষমতার একটা ভিন্ন বোঝাপড়া তৈরী করেছেন। এর মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই যে, ক্ষমতা আদতে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় এবং উপর-নিচ ক্রমশ্চতার ভিত্তিতেই চর্চিত হয়না বরং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ধরন এমনকি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যদিয়েও এই চর্চা করতে পারে । তাঁর এই তত্ত্ব আরও স্পষ্ট করে যে, একজন নিয়ন্ত্রিতও অন্য কাউকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখতে পারে। অর্থাৎ ক্ষমতা এবং শাসন ফুকোর দৃষ্টিতে এমন বিশেষ কিছু যা বিস্তৃত এবং বহুমাত্রিক চেহারাকে প্রকাশ করে থাকে। গভার্নমেন্টালিটি বিস্তৃত এতিহাসিক বিভিন্ন কালকে প্রকাশ করে। ফুকোর কাজে ১৮ শতকের পূর্ব এবং আধুনিক নব্য উদারনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে,আটারো শতকের পূর্বে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা ক্ষমতা ছিলো কেন্দ্রীভূত অন্য দিকে নব্য উদারনৈতিক (আধুনিক অগ্রগামী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা) যুগে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে যেখানে সমাজের ইন্ডিভিজুয়ালদেরকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে স্বশাসিত করা হয়েছে।


Thomas Lemke গভার্ণমেন্টালিটির দুইটি ফিচারকে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ফুকো ক্ষমতাকে সামষ্টিক (macro) পর্যায় থেকে দেখার পরিবর্তে গুরুত্ব দিয়েছেন ক্ষুদ্র (micro) ও ব্যক্তিক পর্যায়ে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির স্বনিয়ন্ত্রণের “স্বশাসনমূলক” সক্ষমতা এবং কিভাবে এটা ব্যক্তিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শাসনের আওতায় নিয়ে আসে। এই পর্যায়ে তিনি দেখান শাসন বা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সাবজেক্ট অবজেক্ট বিভাজন রয়েছে সেখানে কে কিভাবে কাকে নিয়ন্ত্রণ করছে,পরিচালিত করছে তার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, গভার্নমেন্টালিটি এমন প্রক্রিয়ায় ক্রিয়াশীল থাকে যে ব্যক্তি নিজেই নিয়ন্ত্রণের অবজেক্ট এ পরিণত হয়। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় নাগরিক স্বাধীন। ফুকো বলতে থাকেন, যদিও বলা হচ্ছে মানুষ স্বাধীন কিন্তু বস্তুত এটি এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যেখানে ব্যক্তিকে মতাদর্শিকভাবে শৃঙ্খলিত এবং নিয়ন্ত্রিত হতে বাধ্য করা হয়। তিনি এই ক্ষমতার ধরণ/গঠন এবং বিষয়ীকরণ (সাবজেক্টিফিকেশন) প্রক্রিয়ার মধ্যকার যোগসূত্রতাকে স্পষ্ট করেন। 


(চলবে)


লিখেছেন: তত্ত্বের ভক্ত




No comments:

Post a Comment