খুব কম লোকই হয়তো রাধাগোবিন্দ চন্দ্র সম্পর্কে জানেন।
অথচ তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার একজন দিকপাল। আসুন এই বিখ্যাত জ্যেতির্বিজ্ঞানী
সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ১৯৭৮ সালে বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের সফলতম
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন। তিনি এ অঞ্চলে পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায়
অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন।
ছোটকাল থেকেই মহাকাশ সম্পর্কে রাধাগোবিন্দের বিশেষ আগ্রহ
ছিলো। ষষ্ঠ শ্রেণিতে তাঁর চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ নামে একটি পাঠ্যবই ছিলো। এই গ্রন্থে "ব্রহ্মাণ্ড কি প্রকাণ্ড"
নামে অক্ষয়কুমার দত্তের একটি প্রবন্ধ
ছিল। এই প্রবন্ধ তাঁর উপর বিশেষ প্রভাব রেখেছিলো কারণ এটি পড়েই তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী
হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখনিতেও এ বিষয় সম্পর্কে জানা
যায়। তিনি লিখেছেন,"অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া,
নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার
হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।"
তাঁর বয়স যখন ১০ বছর তখন তিনি যশোর জিলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ইংরেজি শেখা শুরু করেন।
এর পাশাপাশি তিনি আকাশের তারা দেখতে শুরু করেন। যশোরের বকচরে অবস্থিত একতলা বাড়ির
ছাদ থেকে প্রত্যহ সন্ধ্যায় তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন এবং চাঁদ দেখতেন।
কিন্তু যেহেতু তখনকার সময়ে তাঁর জ্যেতির্বিজ্ঞানে কোন উপযুক্ত ও কারিগরি জ্ঞান
ছিলো না তাই প্রথম দিকে তাকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিলো বলে জানা যায়। তাঁর বয়স যখন
১৪ বছর তখন থেকে তিনি তারা চেনার ক্ষেত্রে বেশ পটু হয়ে উঠতে থাকেন।
রাধাগোবিন্দের জীবনে সংগ্রাম ছিলো। পড়াশুনা শেষ
করার পর তাকে প্রায় দুই বছের যাবৎ বেকার থাকতে হয়। এরপর মাসিক মাত্র ১৫ টাকা বেতনে যশোরের
কালেকটরেট অফিসে খাজাঞ্চির চাকুরি পান। পরবর্তীতে তিনি ট্রেজারি ক্লার্ক ও
কোষাধ্যক্ষের পদে পদোন্নতি পান। অবসর নেবার সময় তার মাসিক বেতন দাড়িয়েছিল ১৭৫ টাকা।
তিনি সাংসারিক খরচের পাশাপাশি জ্যেতির্বিজ্ঞান চর্চায় যে টাকা খরচ করতেন তারা অনেক
হিসেবই লিখে রাখতেন।
১৯১০ সালে আকাশে হ্যালির ধুমকেতু আবির্ভূত হলে তিনি প্রথমে
খালি চোখে ও পরে একটি বাইনোকুলার দিয়ে পর্যবেক্ষণ
করেন এবং তা লিখে রাখেন। পরে এই পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে এখাধিক প্রবন্ধ লিখে
তা হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
রাধাগোবিন্দ সম্পর্কে যারা জানতেন তারা তাকে বিভিন্ন
ধরনের পরামর্শ দিয়ে উৎসাহ যোগাতে শুরু করেন। শানিনিকেতনে তৎকালীন বিজ্ঞান
শিক্ষক জগদানন্দ রায় তাকে একটি দূরবীন কেনার জন্য পরামর্শ প্রদান
করেন। সে অনুযায়ী ১৯১২ সালের দিকে রাধাগোবিন্দ তাঁর বেতনের টাকা ও খানিকটা জমি
বিক্রির টাকা দিয়ে ৩ ইঞ্চি ব্যাসের একটি প্রতিসরণ দুরবিন ক্রয় করেন। এই দুরবীনকে
পরবর্তীতে তিনি আরো উন্নত করে ব্যবহার করেছেন। এটি তার গবেষণায় অন্যমাত্রা দান
করেছিলো বলে তাঁর নথিপত্র থেকে জানা যায়। এর সাহায্যেই তিনি বিভিন্ন গ্রহরাজি
চিনতে পারেন।
১৯১৮ সালের জুন মাসে তিনি
আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখেন যা তাঁর কাছে থাকা নক্ষত্রের মানচিত্রে অনুপস্থিত
ছিলো। তিনি তাঁর এই পর্যবেক্ষণের কথা হাভার্ড মানমন্দিরে জানান এবং এভাবেই ১৯১৮
সালে নোভা অ্যাকুইলা-৩ আবিস্কৃত হয়। পরে তাকে আমেরিকান এসোসিয়েসন অফ
ভেরিয়েবল স্টার অবজারভার ('American
Association of Variable Star Observers'(AAVSO)) সম্মানসূচক সদস্যপদ প্রদান করে। ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ এর মধ্যে তিনি ৩৭২১৫ টি
পরিবর্তনশীল নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন এবং এসব তথ্য আভসো (AAVSO) কে প্রদান করেন।
তাঁর এই কার্যক্রমের জন্য তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত আভসোর তালিকাভুক্ত হন। এছাড়া তাঁর ধুমকেতুও গ্রন্থটিও
গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাধা গোবিন্ধ ১৯২৬ সালে হাভার্ড মানমন্দির থেকে
ছয় ইঞ্চি ব্যাসের একটি দূরবীন পান। দূরবীনের সাথে হাভার্ড মানমন্দিরের পরিচালক
হ্যারলো শ্যাপলির অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাধাকে একটি চিঠি লেখেন। এরপর ১৯২৮ সালে ফরাসি সরকার পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের ওপর কাজের
জন্য তাকে OARF (Officer d'Academic Republic Francaise) পদকে ভূষিত করেন।
রাধাগোবিন্দ বাংলাদেশের মানুষ হলেও তিনি
বাংলাদেশে সারাজীবন থাকতে পারেননি। ’৪৭ এর বিভাজনের কিছুকাল পর ১৯৬০ সালের দিকে যশোরের তৎকালীন জেলা কমিশনার এম.আর.
কুদ্দুসসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার পরামর্শে তিনি ভারত চলে যান। শেষ জীবনে
ব্যপক আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের ৩ তারিখে ৯৭ বছর বয়সে বিনা চিকিৎসায় ভারতের বারাসাতে রাধাগোবিন্দ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তথ্যসূত্র
তথ্যসূত্র
সম্পাদনা: রায়ান মাহমুদ
No comments:
Post a Comment