বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে বর্তমান মানুষের সম্পর্ক ঠিক শরীরের সাথে শ্বাস প্রশ্বাসের সম্পর্কের মতনই।কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রযুক্তিক যে উৎকর্ষতা ঘটেছে সেখানে পাশ্চাত্যের ভূমিকা অতি উজ্জ্বল হিসেবে দৃশ্যমান। নিত্য নতুন উদ্ভাবন, সময়ের সাথে সাথে জীবনে গতির সঞ্চারণে আমরা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের কাছে ঋণী। এই বিষয়ে হয়তো খুব বেশি মানুষ দ্বিমত পোষণ করবেনা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অনেকেরই অজানা তা হলো পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের এই বিস্তর উৎকর্ষতার পেছনেও গল্প আছে যা অধিকাংশ সময়েই অব্যক্ত কিংবা লুক্কায়িত থেকে গেছে।
পাশ্চাত্যের
ভাবখানা এমন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান উভয়ই স্বতন্ত্র্যভাবে পাশ্চত্যের দান।
চায়নিজ, জাপানি কিংবা কোরিয়ানসহ অন্যান্য যেসব প্রযুক্তি সারা পৃথিবীতে দাপিয়ে
বেড়াচ্ছে তার প্রায় সবই পশ্চিমা প্রযুক্তি।
১৮ শতকের শিল্প
বিপ্লব অথবা ১৭ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবকে পশ্চিমা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের উন্নয়নের
এবং এর মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মনে করা হলেও আদতে এর
শুরুটা আরো প্রাচীন। মূলত ১০০০ অব্দের আগে কিংবা তারও দুই শতাধিক বৎসর পূর্বে
পশ্চিামারা পানি শক্তিকে ব্যবহারের উপর জোর প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। ১২ শতাব্ধীর
শেষের দিকে তারা আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বায়ু শক্তির ব্যবহারে সফল হতে থাকে।
উদ্ভাবনী কর্মকান্ডের শুরুটা সাধারণ হলেও এই ধারাবাহিকতায় অনেক মূল্যবান ও
ব্যয়বহুল যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় ও শ্রমিক নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের উদ্ভাবন ঘটে।
১৪৪৪ সালে একজন বিখ্যাত গ্রীক যাজক, বেছারিওন, আশ্চর্য হয়ে গ্রীকের রাজপুত্রের কাছে
চিঠি লিখেছিলেন। তিনি পশ্চিমা পদ্ধতিতে জাহাজ, হাতিয়ার, গ্লাস ও বুনন শিল্পের আবিষ্কারের
জন্য অবাক হয়েছিলেন। তিনি আরও অবাক হয়েছিলেন পানিতে গাড়ি চালানো ও বাতাসের ঝাপটা
দিয়ে আগুনের চুল্লি জালানো আবিষ্কারের মাধ্যমে। মূলত, ১৫ শতকের শেষের দিকে
পশ্চিমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অন্য মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছিল। বস্তুত তারা পৃথিবীর বিভিন্ন
স্খানে উপনিবেশ বিস্তারের সাথে নিজেদের প্রযুক্তির ও বিজ্ঞানেরও বিস্তার ঘটানোর
কাজ চালাতে থাকে। ১৫৪৩ সালের এর পর থেকে মূলত আধুনিক বিজ্ঞানের শুরু হয়েছিল যখন,
কোপার্নিকাস এবং ভেসালিয়াস তাদের বিখ্যাত কাজসমূহ শুরু করেছিলেন।
তবে, এর ইতিহাস
আলোচনা করলে পশ্চিমা উৎকর্ষতার একক কৃতিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং মুসলিম ও অন্যান্য
বিজ্ঞানীদের কাজের কাছে ঋণী হয়ে যায় যা কদাচিৎ স্বীকার করা হয়। একাদশ শতকের দিকে
অনুবাদের একটি বিপ্লব ঘটে যায়। একটা স্রোত তৈরী হয় যখন ধারাবাহিকভাবে আরবি
ভাষায় রচিত বিখ্যাত সব পুস্তক ও গবেষণাগুলি লাতিন ভাষায় অনূদিত হতে থাকে। পরবর্তী
মাত্র দুইশ বছরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত প্রায় সকল রচনাসমগ্রই লাতিন
ভাষায় সহজলভ্য হয়ে যায়। ব্যাপকভাবে এগুলির অধ্যায়ন এবং সমালোচনামূলক অধ্যায়ন শুরু
হয় যা তৎকালীন বিদ্যমান জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চায় অন্যমাত্রা যোগ করে। ত্রয়োদশ শতকের পর থেকেই মূলত সাংস্কৃতিক বিস্তারের সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধিপত্যও মুসলিমদের
হাত থেকে ইউরোপিয়ানদের হাতে চলে যায়।
মূলত, মধ্যযুগের
বিখ্যাত ইসলামিক বিজ্ঞানীরা এই সব প্রযুক্তির প্রথম উদ্ভাবক যারা তাদের দক্ষতা দ্বারা
প্রাচীন গ্রীকদেরকে পেছনে ফেলেছিল যেমন, আলরাজী- ঔষধ, ইবনাল হাইতাম- আলোক বিজ্ঞান,
এবং ওমর খাইয়াম-গণিত বিষয়ের উদ্ভাবক। তখনকার সময়ে কল্পনাও করা যায়নি জ্ঞান
বিজ্ঞানের কেন্দ্র এভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে কিংবা ইতিহাস থেকে বেড় বড় পন্ডিত
উদ্ভাবকদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
লিখেছেনঃ তত্ত্বের ভক্ত
No comments:
Post a Comment