সামাজিক
অসমতা যাদেরকে ছুঁয়ে যায় তারা হয়তো সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং সেই সমাজের সদস্য
হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। অনেকে এই লক্ষ্যে কাজও করেন। তবে আমার উপলব্ধি এবং দর্শন কিছুটা
ভিন্ন, যদিও ঐ সমতাভিত্তিক সমাজের তালাশে আমার অনাপত্তি ও পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। সামাজিক
অসমতা আমার কাছে বর্তমান সমাজের টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি বলে ধরা দেয়। এছাড়া, বর্তমান
সমাজব্যবস্থা অতি মাত্রায় পুঁজিবাদী হওয়ায় অসমতা আরো পোক্ত হয়েছে কেননা অসমতা পুঁজিবাদের
অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমি থিওডর এ্যাডোর্নোর মতই মনি করি যে পুঁজিবাদকে উৎখাত করার সময়
এবং সুযোগ উভয়ই আমরা অতিক্রম করে ফেলেছি, ফলে পুঁজিবাদের বিনাশ ঘটানো এখন এক অলীক চিন্তা।
বর্তমান
সমাজে সামাজিক বিয়িং হিসেবে আমাদের জীবন অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক এবং যান্ত্রিক হয়ে
পড়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং যান্ত্রিকতা ক্রমশঃ ঠিক একই প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিযে
পুনরৎপাদিত হচ্ছে। ফলে, আমাদের জৈবিক এবং মানসিক বিচরণ সীমায়িত হয়ে পড়ছে, যদিও আমরা
বোধ করতে থাকি আমরা আগের তুলনায় একটু বেশিই স্বাধীন এখন।
এই
অসমতাকে যদিও আমরা অস্বীকার করতে পারিনা, তারপরও “মানবিকতা”
এমন এক দোহায় যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সকল অসমতাকে শিথিল করতে চায়। সমাজ এখানে একটা দ্বান্দিক
টানাপোড়েন সৃষ্টি করে: একদিকে “অসমতা” বর্তমান সমাজ কাঠামোর এক মৌলিক উৎপাঁদ অন্যদিকে
মানবিকতাও সামাজিকতা হিসেবে ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিত করে। এই মানবিকতাই হচ্ছে সেই সামাজিকতা
যা ক্রমশ্চতাপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক মানে অধিপতি এবং অধস্তন সম্পর্কের বিন্যাস থেকে
সৃষ্ট নিপীড়নসমূহের বেমালুম বিরোধীতা করে। ধরেন আপনার প্রতিবেশী লোকটি বাড়ির “কাজের লোককে মারে” আপনি দেখে বলেন “আহ! লোকটা কি পাজি, এভাবে কেউ মারে!”। আদতে, তারা দু’জন সে সম্পর্ক কাঠামোতে যুক্ত থাকে সেখানে “কাজের লোকের” উপর মালিকের এই জোরখাটানো অর্থাৎ মারপিট একরকম অবধারিত।
এই কাঠামোতে কেউ হাতে মারে কেউ বা আবার মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে
মারে। যেমন ধরেন আপনি যে অফিসে কাজ করেন সেখানে পার্ফর্মেন্স এর অজুহাতে আপনার বেতনের
টাকা কেটে নেয়া হলো বা ধরেন আপনাকে চাকরিচ্যুত করা হলো। বস্তুত, মালিকের এই অধিকারই
সমাজের অসম রুপ যা আমাদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে জায়েজ হয়। আমরা এর বিরোধীতা
করতে পারিনা। আদতে, এহেন অবস্থায়ই আমাদের পরাধীনতা। যদিও আমরা তা অস্বীকার করি এবং নিজেরাই
নিজেদেরকে দায়ী করি।
সামাজিক
জীবনের নানান সম্পর্কের মধ্যে আমরা এই অসমতাকে সাক্ষাৎ করতে থাকি যা নির্মিত কাঠামোকে
বৈধতা এবং স্থায়িত্ব দিয়ে চলে। খোলাসা করি, যেমন ধরুন ‘অফিস’
একটা প্রতিষ্ঠান। যেখানে ব্যক্তির পরিচয় তার ব্যক্তিত্বে নয় বরং পদে। এই পদবিন্যাস
এক ক্রমশ্চতাপূর্ণ সামাজিক নির্মাণ যেখানে কেউ আদেশ করে আবার কেউ আদিষ্ট হয়। কিন্তু
অধিপতি শ্রেণির মতাদর্শিক আধিপত্যের সফলতা আপনার মস্তিস্ককে এমনভাবে ওয়াশ করে যে আপনি
নিজের উপর চলতে থাকা নিরন্তর কর্তৃত্বকে দেখতে পাননা।
লিখেছেন: তত্ত্বের ভক্ত
No comments:
Post a Comment